কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :
গণভোটের রায় কার্যকর ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদে জোরালো আলোচনার পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। বর্তমানে দেশজুড়ে ‘প্যাকেজ কর্মসূচি’ পালন করা হলেও দাবি আদায়ে কাজ না হলে পর্যায়ক্রমে কঠোর আন্দোলনের কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে জোটটি।
ইতোমধ্যে গণমিছিল, সেমিনার, লিফলেট বিতরণ ও দেয়াল লিখনের পর বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ সম্পন্ন করেছে ১১ দল। এবার ঢাকায় বিশাল মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে জোটের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী। মূলত জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই জাতীয় সমাবেশ থেকে সরকারকে একটি কড়া বার্তা দিতে চায় তারা।
১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা জানান, সংসদে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা। তাদের দাবি, রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে কর্মসূচির তীব্রতা বাড়ানো হবে। পরিস্থিতি বুঝে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়ার বিষয়েও জোটের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে।
পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৯ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ, জেলা ও বিভাগীয় শহরে বিক্ষোভ এবং ঢাকায় জাতীয় সেমিনারের মতো কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। পরবর্তীতে ১৬ এপ্রিল জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে নতুন আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন কর্মসূচি অনুযায়ী, গত ১৮ এপ্রিল ঢাকায় গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ২৫ এপ্রিল বিভাগীয় শহরগুলোতে এবং ২ মে জেলা শহরগুলোতে গণমিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বিভাগীয় ও গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে সেমিনার এবং লিফলেট বিতরণ চলবে। এর মধ্যেই ঢাকায় পরপর দুই দিন দুটি বড় মহাসমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দেয়। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত সদস্যদের সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথটি নেননি। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া থমকে আছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে, যা দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি করছে। তবে বিএনপির দাবি, তারা সনদের অধিকাংশ বিষয় বাস্তবায়ন করছে; কেবল কিছু বিশেষ ইস্যুতে (নোট অব ডিসেন্ট) আরও সময় নিতে চায় তারা।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা যেমন সংসদে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন, তেমনি সরকারকে চাপে রাখতে রাজপথেও জোরদার কর্মসূচি শুরু করেছেন।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “আমরা চাই বিএনপি জনরায়কে সম্মান জানিয়ে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করুক। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই ধাপে ধাপে সাজানো ‘প্যাকেজ আন্দোলন’ চলতেই থাকবে। সরকার যদি গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন না করে, তবে আমরা মহাসমাবেশসহ আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দেব।”
জোটের লিয়াজোঁ কমিটির নেতারা শুরুতে আশা করেছিলেন, বিএনপি সরকার গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার কাজ শুরু করবে। কিন্তু বর্তমানে সরকারের অবস্থানকে সংস্কারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন তারা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিএনপি ঐকমত্য কমিশনে থেকে সবখানে স্বাক্ষর করলেও এখন সব অবজ্ঞা করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশের নাজুক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমরা এখনই হরতাল-অবরোধ না দিয়ে ধাপে ধাপে কর্মসূচি দিচ্ছি। কিন্তু বিএনপি যদি পরিবর্তন না চায় এবং পূর্ববর্তী সরকারের মতো আচরণ করে, তবে জনরোষের মুখে সরকার শান্তিতে থাকতে পারবে না।’
এর আগে ১৬ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হলে তার ফল শুভ হবে না। ১১ দলীয় জোটের সূত্রমতে, ২ মের পরবর্তী আন্দোলনের প্রাথমিক রূপরেখা ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে, যা আগামী ৩০ এপ্রিলের বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম এ প্রসঙ্গে ঢাকা পোস্টকে বলেন, জনগণ এখন ক্ষুব্ধ। বিএনপি সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের চড়া মাসুল দিতে হবে। বর্তমানে আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছি, তবে দাবি মানা না হলে অচিরেই ‘নরম’ কর্মসূচি থেকে ‘গরম’ কর্মসূচির দিকে যাবে ১১ দল।
এদিকে, শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঢাকায় ‘জাতীয় সমাবেশ’-এর ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকাল ১০টায় শুরু হতে যাওয়া এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জুলাই বিপ্লবের আট শতাধিক শহীদ পরিবার, আহত সদস্য এবং হাজারো ‘জুলাই যোদ্ধা’র উপস্থিতিতে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদেরও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে রাখা হয়েছে, যাতে সমাবেশটি একটি সর্বদলীয় রূপ পায়।
একই দিনে রাজধানী বাদে দেশের সকল মহানগরীতে ১১ দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষিত গণমিছিল কর্মসূচি পালিত হবে। এই কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধসহ জনজীবনের নানামুখী সমস্যা সমাধানের দাবিতেই আমাদের এই আন্দোলন।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশ এক গভীর সংকটকাল অতিক্রম করছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মাধ্যমে নাগরিকরা যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে, তা বাস্তবায়ন করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। এই আন্দোলন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার ও একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে নেমে জনগণের দাবি আদায়ে সোচ্চার হতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে ৩৬ জুলাইয়ে যে নতুন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে, সেখানে মানুষের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার। জুলাই বিপ্লবের পর সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছে, তার আলোকেই আগামী দিনে দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা। সেই লক্ষ্যেই গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে জনগণের সেই রায় বাস্তবায়ন না করে এখন একধরনের তামাশা শুরু হয়েছে। তাই গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতেই আমরা এই গণসমাবেশের ডাক দিয়েছি। আশা করি, মানুষের দাবি আদায়ে এই সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
(মূল রিপোর্ট : ঢাকা পোস্ট)