কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :
ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা (ডেঞ্জার জোন) সিলেটে গত এক মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৩২টিরও বেশি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি ছিল মাঝারি মাত্রার এবং ২৫টিরও বেশি ছিল মৃদু বা ছোট কম্পন। এত অল্প সময়ে, বিশেষ করে গত কয়েক দিনে সিলেট ও এর আশপাশের অঞ্চলে ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘন ঘন কম্পন বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত সিসমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২৪ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিলেট ও এর আশপাশের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এই ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প ছিল, যেগুলোর মাত্রা রিখটার স্কেলে ৪.০ থেকে ৫.২ পর্যন্ত।
মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর উৎপত্তিস্থল। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে অনুভূত হওয়া ৪.১ মাত্রার এবং ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অনুভূত হওয়া ৪.০ মাত্রার ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে মাত্র ২১ কিলোমিটার দূরে। এছাড়া গত ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে সিলেট থেকে ৩৪৮ কিলোমিটার দূরে ৫.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী কম্পন রেকর্ড করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি একই দিনে দুটি (৪.১ ও ৪.২ মাত্রার) এবং ১৭ ও ২৪ জানুয়ারি যথাক্রমে ৪.২ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
অন্যদিকে, গত এক মাসে ২৫টিরও বেশি ছোট মাত্রার (২.৫ থেকে ৩.৯ মাত্রা) ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সময় সিলেট ও এর আশপাশে মাটি কেঁপে উঠছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে মাত্র ২৬ থেকে ১০০ কিলোমিটারের ভেতরে।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সিলেট বরাবরই ভূমিকম্পের অতি ঝুঁকিপূর্ণ বা ১ নম্বর 'ডেঞ্জার জোন'-এ অবস্থিত। ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা- এই তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে এবং ভয়ংকর 'ডাউকি ফল্ট'-এর খুব কাছাকাছি হওয়ায় সিলেটে বড় ধরনের ভূমিকম্পের শঙ্কা সবসময়ই প্রবল। শুধু ডাউকি ফল্টই নয়, সিলেটের খুব কাছেই রয়েছে অত্যন্ত সক্রিয় 'কপিলি ফল্ট', যা এই অঞ্চলের জন্য সমান হুমকিস্বরূপ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মেঘালয় থেকে সিলেট সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই কপিলি ফল্টে ভূতাত্ত্বিক ফাটল বা প্লেটের নড়াচড়ার কারণেই সম্প্রতি এত ঘন ঘন ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে।
ভূতত্ত্ববিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, ডাউকি ফল্টে প্রচুর পরিমাণে শক্তি জমা হয়ে আছে। ১৮৯৭ সালের 'গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক' (যাতে সিলেট প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল)-এর পর গত ১০০ বছরেরও বেশি সময়ে এই অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো শক্তি নির্গত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথমত, এর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ শক্তি ধীরে ধীরে বের হয়ে যাচ্ছে, যা ভালো লক্ষণ। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো- এই ছোট কম্পনগুলো ফোরশক হতে পারে। যা মূলত সামনে আসতে যাওয়া রিখটার স্কেলে ৭ বা ৮ মাত্রার কোনো ভয়াবহ বড় ভূমিকম্পের অশনিসংকেত।
এমন অবস্থায় ঘন ঘন ভূকম্পনের ফলে সিলেটের বহুতল ভবন ও মার্কেটগুলোর বাসিন্দারা আতঙ্কে দিন পার করছেন। একটু কম্পন অনুভব করলেই মানুষজন রাস্তায় নেমে আসছেন। সিলেট নগরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য বহুতল ভবন, জলাশয় ভরাট করে তৈরি করা স্থাপনা এবং সরু রাস্তার কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর যে তালিকা রয়েছে, দ্রুত সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে সচেতন করতে নিয়মিত মহড়া ও সরকারি পর্যায়ে জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃতি হয়তো বারবার ছোট কম্পনের মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করারই চেষ্টা করছে।
(মূল রিপোর্ট : ইমজানিউজ)