ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে নতুন তথ্য

কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :

বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী গুমের নেপথ্যে কারা ছিলেন, কার নির্দেশে কোনো কোনো কর্মকর্তা গুমের মিশনে অংশ নেন-এমন অনেক স্পর্শকাতর তথ্য বের হয়ে আসছে। এ বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ইলিয়াস আলী গুমের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে র‌্যাব। 

ঘটনার আগে ও পরে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও র‌্যাবের তৎকালীন ডিজির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন শেখ হাসিনা। র‌্যাব-১-কে দিয়ে তুলে আনা হয় ইলয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককে। ওই অভিযানে থাকা কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো দেশেই অবস্থান করছেন, এমন দাবিও করেছেন মামুন খালেদ।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে ব্যক্তিগত গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। ওই সময় ডিজিএফআই’র মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ।

সেনাবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিরপুর মডেল থানার এক হত্যা মামলায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে এক-এগারোর সরকার ও পরে আওয়ামী লীগ আমলের নানা অপকর্মের হোতাদের তথ্য দিচ্ছেন মামুন খালেদ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

ইলিয়াস আলী গুমের বিষয়ে শেখ মামুন খালেদ গোয়েন্দাদের কাছে বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও জেরার একপর্যায়ে স্বীকার করেছেন গুমের অভিযানের সময় ডিজিএফআইর দুজন মেজর প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার আরও কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন।

কেন ইলিয়াস আলীকে গুম করা হলো- গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এমন প্রশ্নের জবাবে মামুন খালেদ বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দেন ইলিয়াস আলী। এসব কারণেই তাকে গুম করা হয়।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে- ডিজিএফআইর তৎকালীন মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের নকশাতেই এম ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। ২০১২ সালে ঘটনার ওই রাতে মামুন খালেদের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী, ডিজিএফআই ও র‌্যাবের বিশেষ দল ইলিয়াস আলীকে গুম করে।

এছাড়া ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের সঙ্গে কোন কোন সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, ঘটনার আগের রাতে কোথায় তারা বৈঠক করেন সেসব বিষয়ে গোয়েন্দাদের বিস্তর তথ্য দিচ্ছেন শেখ মামুন খালেদ।

মামুন খালেদকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যা মামলায় প্রথম দফায় ৫ দিনের রিমান্ডে শেষে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে ফের ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড শুনানি চলাকালে মামুন খালেদ বলেন- ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর অবসর গ্রহণ করি। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ১ বছর ৩ মাস দায়িত্ব পালন করেছি। আমি কমিউনিকেশন অফিসার ছিলাম। আমার তিনটা পিএইচডি, পাঁচটি মাস্টার্স রয়েছে। আমি ২২ বছর একাডেমিক কাজে ছিলাম।

শুনানিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন- ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কল্যাণে কাজ করেছেন মামুন খালেদ। যারা এক-এগারোতে কাজ করেছেন, শেখ হাসিনা তাদের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে সুবিধা দিয়েছেন। এজন্য তারা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ কাজ করেছে। অফিসারদের বঞ্চিত করে ফ্যাসিস্টদের সহযোগীদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। ফ্যাসিস্টদের সহযোগীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অনেককে জোরপূর্বক চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এমনকি বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে ৫৪ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে। পুনরায় তার ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা আবেদন করেন পিপি।

এদিকে এক-এগারোর সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখা আরেক সেনা কর্মকর্তা ডিজিএফআইর সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. আফজাল নাছেরকে সোমবার ভোরে জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৬ দিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে তাকে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হচ্ছে-এক-এগারোর সরকারের সময় বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্যাতন। রিমান্ডে টাকা আদায়ের কথা স্বীকার করে তিনি বলেছেন, সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশে ওই সময় বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকপক্ষকে ডেকে আনা হতো। তাদের কাছ থেকে টাকাও আদায় করা হয়েছে। তবে সেসব টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। ওই সময় মোট ৯০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন আফজাল।

তিনি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেন- এক-এগারোর সময়ে ডিজিএফআই পরিচালকের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে টাকা আদায় করা হতো। এক-এগারোর সরকারের সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। বিতর্কিত অনেক সেনা কর্মকর্তা সেসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন-গোয়েন্দাদের এমন প্রশ্নে আফজাল নাছের দাবি করেন, তিনি নিয়মের বাইরে কিছু করেননি।

এদিকে তারেক রহমানকে নির্যাতনের বিষয়ে গোয়েন্দারা জানতে চাইলে আফজাল নাছের বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি বিশেষ এক অ্যাসাইনমেন্টে ঢাকার বাইরে ছিলেন। টানা ২ মাস পর তিনি ঢাকায় ফেরেন। আফজালের এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য না বলে মন্তব্য করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

জেরার মুখে আফজাল নাছেরের দাবি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময় নির্যাতনের মূল ভূমিকায় ছিলেন ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। তবে তারেক রহমানকে সরাসরি নির্যাতন করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার।

এক-এগারোর সরকারের আরেক কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানব পাচার আইনে করা এক মামলায় রিমান্ডে রয়েছেন। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা এক-এগারোর সরকারের আমলে কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

এক-এগারোর সময় ট্রুথ কমিশন গঠনের মাধ্যমে তিন শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন-এমন তথ্যের ব্যাপারেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পৃথক দুটি মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মানব পাচারসংক্রান্ত দুদকের এক মামলায়ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার গ্রেফতার করা হয়েছে এক-এগারোর আরেক কুশীলব আফজাল নাছেরকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, যেসব মামলায় সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের রিমান্ডে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এক-এগারো ও পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন,আসামিদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।


(মূল রিপোর্ট : যুগান্তর)