কওমি কণ্ঠ ডেস্ক :
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর সিলেটে সবুজের সমারোহে অবস্থিত ৩২০ একরের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সবুজে ঢাকা ক্যাম্পাস শুষ্ক মৌসুমে যেন ধুলোয় আবৃত হয়ে আছে। এতে অতিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ধুলোর ছড়াছড়িতে ভারী হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসের বাতাস। যেন নিঃশ্বাস নেওয়ার উপায় নেই। বাড়ছে ধুলাবালি-জনিত অসুখের প্রকোপ।
সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ছেলে ও মেয়েদের হল পর্যন্ত প্রতিটি রাস্তা ধুলোয় অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় বিরাজ করছে। গাছের সবুজ পাতায় ধুলোর আস্তরণ জমে ধূসর হয়ে গেছে। এসব রাস্তায় মাস্ক ছাড়া হাঁটা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। কয়েকদিন ক্যাম্পাসে ধুলো কমাতে পানি ছিটানো হলেও তা অপর্যাপ্ত ছিল বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
মূলত ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অধিকতর উন্নয়নের ১৭টি প্রকল্পের কাজ চলমান। এসব কাজে ব্যবহৃত বালি, ইট ও সিমেন্টবাহী গাড়ি ক্যাম্পাসের রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় এসব গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া মাটি ধুলোতে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া নিয়মিত মাটি ও বালি আনা–নেওয়া করায় পুরো ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলো মাটি ও বালিতে ঢেকে গেছে। ফলে হালকা বাতাস কিংবা যানবাহন চলাচল করলেই বাতাসে ধুলো ছড়িয়ে পড়ছে। এতে প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে ধুলাদূষণ। বাতাসে কমছে অক্সিজেনের পরিমাণ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
তাছাড়া ক্যাম্পাসের আশপাশে সড়কের পাশে অনেক খাবারের দোকান রয়েছে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় খাবার গ্রহণ করছে। এসব ধুলো-বালি যুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের ফলে তারা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
নিয়মিত পানি ছিটিয়ে না দেওয়ায় ধুলাবালির পরিমাণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলোতে প্রচুর ধুলাবালির কারণে সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এমনকি রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, নিঃশ্বাসে অক্সিজেনের পরিবর্তে ধুলাবালি গ্রহণ করতে হচ্ছে।
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ বলেন, ক্যাম্পাসে ধুলাবালির পরিমাণ এত বেশি যে মাস্ক ছাড়া চলাচল দুষ্কর। এতে করে শিক্ষার্থীদের অসুস্থতা বাড়ছে। আমার শীত মৌসুমে কখনো সর্দি হয় না। কিন্তু এই মৌসুমে ধুলোর কারণে গত এক মাস যাবৎ সর্দি ও কাশিতে ভুগছি। তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি এর জন্য সম্পূর্ণ প্রশাসন দায়ী। এটি মানবসৃষ্ট ধুলো। উন্নয়নমূলক কাজে যানবাহন ব্যবহারের বিকল্প ব্যবস্থা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে কাজ করার কোনো মানে হয় না। এত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভোগান্তি কখনোই ভালো হতে পারে না।
নুসাইবা সারা নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ধুলোতে আমার এলার্জি থাকায় ক্যাম্পাসে এলেই চুলকানি ও কাশি বেড়ে যায়। রুমে গিয়ে চুলকানির কারণে অন্য কোনো কাজ কিংবা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারি না। এদিকে কাশিতে বুকে কফ জমে ইনফেকশন হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার বলেন, ক্যাম্পাসে ধুলো-বালির প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাবিপ্রবি ছাত্রদলের স্মারকলিপির প্রেক্ষিতে প্রশাসন কয়েকদিন পানি স্প্রে করলেও তা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় অবিলম্বে নিয়মিত পানি স্প্রে কার্যক্রম পুনরায় চালুর জোর দাবি জানাচ্ছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র সূত্রে সূত্রে জানা যায়, শুধু এই মৌসুমে ধুলাবালি-জনিত রোগের ওষুধ সেবা মোট ওষুধ সেবার প্রায় ৮০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সর্দি, জ্বর, কাশি, অ্যাজমা ও এলার্জির ওষুধ নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
চিকিৎসা কেন্দ্রের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মাসরাবা সুলতানা বলেন, ধুলাবালি-জনিত কারণে অনেক ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সর্দি-কাশি, অ্যাজমা ও এলার্জি অন্যতম। এছাড়া খাবারের মধ্যে ধুলাবালি পড়লে সেই খাবার গ্রহণের ফলে ডায়রিয়াসহ পেটের নানা সমস্যা এমনকি হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। গত দুই মাসে আমাদের ক্যাম্পাসে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এসব সমস্যা নিয়ে মেডিকেলে এসেছেন। এটি একটি অশনিসংকেত। কিছুক্ষণ আগেও এক শিক্ষার্থী শ্বাসকষ্ট নিয়ে এসেছিলেন। পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকায় তাকে কিছুক্ষণ অক্সিজেন দিয়ে প্রাথমিকভাবে সুস্থ করা হয়েছে। এছাড়া এই দুই মাসে এত রোগী এসেছে এসব সমস্যা নিয়ে যে আমাদের মেডিকেলে কাশির সিরাপও শেষ হয়ে গেছে। আমরা শিক্ষার্থীদের মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি। তবে সুষ্ঠু সমাধান না হলে শিক্ষার্থীদের এভাবে কতদিন ভোগান্তি পোহাতে হবে, তা বলা কঠিন। আমরাও এর ভুক্তভোগী।
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী, উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
(মূল রিপোর্ট : সিলেটের ডাক)